মা দুর্গা বাপের বাড়ি ফিরতেই গ্রামের মেয়েরা বাপের বাড়ি ফেরেন মা লক্ষ্মীর টানে

তখন গ্রামে কোনো সেচখাল ছিল না। ছিল না বিদ্যুতও। অত্যন্ত উর্বর জমি থাকলেও বৃষ্টির উপর নির্ভর করে ধান চাষ হতো। বর্ষাকাল ছাড়া বাকি সময়টা এ পুকুর সে পুকুরের জলে সবজি চাষ করতে হতো । তাই চাষবাসে লক্ষ্মীর কৃপা পাওয়ার জন্য প্রায় সত্তর বছর আগে শুরু করলেন বারোয়ারি লক্ষ্মী পুজো। ক্রমে লক্ষ্মীর কৃপা দৃষ্টি পড়লো শস্যগোলা বর্ধমানের কৃষিপ্রধান  রায়নার নতুন গ্রামের  চাষিদের উপর গ্রামে এলো দামোদরের সেচ খাল। এলো বিদ্যুৎ। শস্য শ্যামলায় ভরে গেল গোটা গ্রাম। পরে গ্রামে দুর্গাপুজোরও আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু দুর্গার মূর্তিতে মাটি দেওয়ার দিনেই এক উদ্যোক্তার অকাল প্রয়াণ ঘটলো। তার পর থেকে গ্রামে আর দুর্গাপুজো করার নামও নেওয়া হয় না।  একেবারে উলোটপুরাণ মা দুর্গা হেরে গেছেন মেয়ে লক্ষ্মীর কাছে। গ্রামে কোনোদিন দুর্গাপুজো হয়নি বলে  এই লক্ষ্মী পুজোকে ঘিরে জাঁকজমক ভক্তি নিষ্ঠা চোখে পড়ার মতো।  গ্রামে কোনো পারিবারিক দুর্গাপুজোও নেই। তাই গ্রামের বিবাহিতা মেয়েরা দুর্গাপুজোর সময় নয় বারোয়ারি লক্ষ্মী পুজোয় সামিল হতে শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়ি ফেরেন। দূর দূরান্তে চাকরিরত ও ব্যবসায়ী এই গ্রামের ছেলেরা বাড়ি ফিরে আসেন। বেড়াতে আসেন আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধবরা। লক্ষ্মী পুজো এতটাই ধুমধাম করে হয় যে  এই পুজোকে ঘিরে সারাটা বছর এই দিন্টির অপেক্ষায় বসে থাকেন গ্রামবাসীরা।  পাকা যে মন্দিরে লক্ষ্মী পুজো হয় সেই মন্দিরেই কালী পুজোর আয়োজন দীর্ঘদিনের।  তবে এখানে দীপাবলীর কালী পুজোর চেয়ে ফাল্গুন মাসের কালীপুজোই বেশ জাঁকজমক ভাবে হয়ে থাকে। এই বারোয়ারি পুজো কমিটির সম্পাদক বিবেকানন্দ পাত্র বললেন রায়নার এই অঞ্চলের জমি খুবই উর্বর।  ঠিকমতো জল পেলে তিন ফসলি এমনকি চার ফসল উৎপাদন হতে পারে।  আমাদের পূর্বসূরিরা এখানকার জমিতে কেবলমাত্র বর্ষার সময়েই প্রকৃতির দেওয়া জলে ধান উৎপাদন করতেন।  বাকি ক-মাস  পুকুর থেকে জল বয়ে সবজি চাষ করতেন। সেচ ব্যবস্থাই ছিল না।  বিদ্যুতও ছিল না। তখন গ্রামবাসীরা মা লক্ষ্মীর কৃপা পাওয়ার জন্য চাশবাসে আরো উন্নয়ন ঘটানোর লক্ষ্যে বারোয়ারি লক্ষ্মী পুজো শুরু করলো।  প্রায় সত্তর বছর আগে  এই পুজো শুরু হয়। তারপর মা লক্ষ্মীর গ্রামের উপর দৃষ্টি দেন।  পঞ্চাশ বছর আগে দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশনের সেচ খাল গ্রামে প্রবেশ করে।  বিদ্যুতও আসে। এখন তিন ফসলি জমি মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদে ঘরে তুলতে পারেন চাষিরা। তিনি আরো জানান, চাষবাসের সমস্যার সমাধান  যাওয়ায় গ্রামবাসীরা একত্রিত হয়ে দুর্গাপুজো করবে বলে উদ্যোগ নেন। বছর দশেক আগে ১৫ আগস্ট  দুর্গাপুজোর জন্য কমিটি গঠন করে দুর্গা প্রতিমা তৈরির জন্য মাটি দেওয়ার কাজ শুরু হলে  ওই দিন বজ্রপাতে মারা যান কমিটির সম্পাদক সুকুমার মন্ডল।  সেই প্রথম এবং শেষ দুর্গাপুজো করার আয়োজন। তারপর থেকে আর গ্রামে দুর্গাপুজো করার কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। তাই লক্ষীপুজোয় আমাদের গ্রামে সর্বজনীন পুজোর রূপ নিয়েছে।  লক্ষ্মী পুজোই দুর্গাপুজোর সমান।  গ্রামের গৃহবধূ আশা ঘোষ বললেন বিয়ে হওয়ার পর থেকেই এই গ্রামে দেখে আসছি লক্ষীপুজোই হয় এখানে  দুর্গাপুজোর কোনো প্রচলন নেই। তাই লক্ষ্মী পুজোর সময় ছেলেমেয়েদের নতুন জামাকাপড় হয়।

Leave a Reply