রাজা তেজচন্দ্রকে ঘোর অমাবস্যায় চাঁদ দেখিয়ে অবাক করেছিলেন সাধক কমলাকান্ত

রাজা তেজচন্দ্রকে ঘোর অমাবস্যায় পূর্ণচন্দ্র দেখিয়ে অবাক করে দিয়েছিলেন সাধক কমলাকান্ত । তাঁর আরোধ্যা দেবীর যে প্রাণ আছে তা প্রমান করতে দেবীমূর্তির পায়ে কাঁটা ফুটিয়ে রক্তপাত করেছিলেন। এমনও শোনা যায়, সাধক মায়ের পুজোর জন্য কারণসুধা নিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে রাজার মুখোমুখী হয়ে যান। তখন ওই পাত্রে কী আছে দেখতে চাইলে দুধ দেখিয়েছিলেন রাজাকে।  সাধক কমলাকান্তের গানে ভক্তিরস, সঙ্গীতরস ও কবিত্বের পান্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে বর্ধমান মহারাজ তেজচন্দ্র তাঁকে সভাপন্ডিত করেছিলেন। বর্ধমানের গলসির চান্না গ্রামে পঞ্চমুন্ডির আসনে বসে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন এই মাতৃসাধক। শহর বর্ধমানের রাজবাটি পেরিয়ে কিছুটা পশ্চিম দিকে গেলেই মিলবে বোরহাট।

burdwan-kamalakanta-kali_photo_important_priyanka_burdwan_29-4

সেই  বোরহাটে রাজাদের তৈরি মন্দিরে পঞ্চমুন্ডির আসনে বসেও সাধনভজন করতেন। তাঁর নানা অলৌকিক জীবনকথা জনপ্রবাদের আকারে বর্ধমানজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে।জানা গেছে,  কমলাকান্তের জন্ম অম্বিকা  কালনায় ১৭৭০ সালে। বাল্যকালে পিতৃবিয়োগ হওয়ার পর অত্যন্ত দারিদ্রের কারনে গলসির চান্না গ্রামের মামার বাড়িতে চলে আসেন। এখানেই তিনি প্রতিপালিত হন। কথিত আছে, তিনি চান্না গ্রামের বিশালাক্ষী মন্দিরে পঞ্চমুন্ডির আসনে বসে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। তাঁর সিদ্ধিলাভের কথা, অলৌকিক ঘটনা, ভক্তিগীতি ও কবিত্বের পান্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে ১৮০৫ সালে তাঁকে চান্না গ্রাম থেকে বর্ধমান রাজসভায় নিয়ে এসে সভাপন্ডিত বা সভাকবি করেছিলেন মহারাজা তেজচন্দ্র। তেজচন্দ্র তাঁর পুত্র প্রতাপচন্দ্রের শিক্ষার ভারও তুলে দিয়েছেলেন কমলাকান্তের উপরে। তখন সাধককে বোরহাটে কালীমন্দির তৈরি করে দেন রাজা। সেই মন্দিরেই পঞ্চমুন্ডির আসনে বসে সাধনা করেছিলেন তিনি।

burdwan-kamalakanta-kali_photo_important_priyanka_burdwan_29-2

সেখানেই টোল খুলে সংস্কৃত বিদ্যাদান করেছিলেন। অবসর সময়ে শ্যামাসঙ্গীত রচনা করতেন। সাধক রামপ্রসাদের মতোই কমলাকান্তের জীবনও নানা আলৌকিক কীর্তিকলাপে ভরা। একবার দস্যুর দল তাঁর কাছ থেকে অর্থহরণ করে হত্যা করতে এসে তাঁর গান শুনে চরণে শরণ নিয়ে ডাকাতিই ছেড়ে দেয়। স্বয়ং দেবী নানান বেশে এসে তাঁর গান শুনতেন। একবার দেবী কালীকা বাগ্দিনী বেশে এসে তাঁকে মাছ জুগিয়েছিলেন। কাশীতে একবার মহামারি শুরু হয়েছিল। তখন ভক্তগণের অনুরোধে কমলাকান্ত কাশীতে গিয়ে মাতৃ সাধনার মধ্যে দিয়ে মহামারি রোধ করেছিলেন। এসব নানা গল্পকথা আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ১৮২০ সালে মাত্র ৫০ বছর বয়সে বোরহাটের মন্দিরেই দেহ রেখেছিলেন সাধক কমলাকান্ত। দেহ রাখার সময় তাঁর ইচ্ছা ছিল গঙ্গায় যাওয়ার। কিন্তু মা কালীকেও ছেড়ে যেতে চাইছিলেন না। তাই মৃত্যুর সময় মন্দির প্রাঙ্গনে মাটি ফুঁরে গঙ্গাজল বের হয়। তারপর ওই স্থানে কুয়ো করে দেওয়া হয়েছে। সেই কুয়োর জলে আজও কালী পুজোর সময় ভোগ রান্না হয়ে আসছে। গ্রীষ্ণে অন্যত্র জলের টান দেখা গেলেও এই কুয়োর জল শুকোয় না। ১৯৭৮ সালে মহারাজা উদয়চাঁদ মন্দির পরিচালনার জন্য একটি ট্রাষ্ট কমিটি গঠন করেন। গত বছর থেকে মাটির প্রতিমার পরিবর্তে কষ্টিপাথরের কালীর মূর্তির পুজো শুরু হয়েছে। তাই ঘট বিসর্জন  হয়। মূর্তির বিসর্জন  নেই। মন্দির প্রাঙ্গনেই কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ বসানো হয়েছে। কালী পুজোতে অন্নকুটের মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয়। ৩১ অক্টোবর কমলাকান্ত দিবস পালিত হবে।

One thought on “রাজা তেজচন্দ্রকে ঘোর অমাবস্যায় চাঁদ দেখিয়ে অবাক করেছিলেন সাধক কমলাকান্ত

Leave a Reply