ইন্দ্র সত্যিই তুই ছবি !

লিখছেন ‘এই সময় ‘ পত্রিকার বিশিষ্ট সাংবাদিক  রূপক মজুমদার

জীবন মরণের সীমানা ছাড়িয়ে  , বন্ধু হে আমার রয়েছে দাঁড়ায়ে ………………। আমার ইন্দ্র । আমাদের ইন্দ্র। দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকার ইন্দ্রনীল সরকার। আজ  আমাদের সীমা ছাড়িয়ে  বহু বহু দূরে। রবীন্দ্রসংগীত ভালোবাসা ইন্দ্র রোজ সকালে উঠে ‘কাঠ টগর’ ফুল তুলে বাবার ছবিতে দিয়ে ৮১ বছরের বৃদ্ধা মা কে স্নান করিয়ে, খাইয়ে সারাদিনের ওষুধ গুছিয়ে রেখে তবেই রোজ ২ টোর লোকাল ধরে বৈঁচি গ্রাম থেকে বর্ধমান স্টেশনে , এর আগে কত জনের সঙ্গে কত রকম কথা সেটা না বলাই শ্রেয়। সেই মানুষটা আমাদের সবার বন্ধুটা একেবারে চুপিসারে , কাউকে কিছু না বলে তারই পছন্দ করা জায়গায় মৃত্যুকে বরণ করে নিল। যেন কিছুটা ইচ্ছা মৃত্যুর মতোনই।  রোজ সন্ধেয় যে ছেলেটাকে ফোন করে বলতো ‘ভাই চা মুড়ি আর খাওয়াবি না’ । সেই ছেলেটার কোলে মাথা রেখে হাসপাতালে যাওয়ার আগেই শেষ। সব শেষ। কবির ভাষায় অনেকটা ঠিক ‘তোমার হৃদয়ে কান পেতে আমি স্তব্ধ ,চোখে জল, বুকে পাথর। ঘিরে আছে নিস্তব্ধ। ’

মাত্র সাড়ে চারবছর আগের কথা। তখনও বৈঁচির সেই অখ্যাত গ্রামের ইন্দ্রকে সেভাবে চিনতামই না। পরে বর্ধমানে এসে ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা। আর সেই ঘনিষ্ঠতা একেবারে পারিবারিক সম্পর্কের গভীরে পৌঁছে যায়। প্রতি মঙ্গল ও শনিবার বর্ধমান পোস্টের অফিসে আমার স্ত্রী , মিঠুন ও ইন্দ্র একসাথে চা খেত। এই দুটো দিন আমার ছেলের টিউশন থাকায় আমার  স্ত্রী (পিউ) ছেলেকে নিয়ে আসতো। আর এই দেড় দু ঘন্টা বর্ধমান পোস্টের অফিসে বসে থাকতে হয় ছেলের অপেক্ষায়। আমাকে এই নিয়ে যে কতবার কত কথা আমায় বলেছে ভাবলে বুকটা ফেটে যায়।

whatsapp-image-2016-11-24-at-20-42-20

ইন্দ্র তুই যে কতবার বলেছিলিস মা  আমার প্রাণ। সেই বুড়ো মাকে এভাবে ফেলে রেখে চলে যেতে পারলি? আর কে নিয়ম করে ওষুধ খাওয়াবে তাকে। রাত সাড়ে এগারোটার সময় মায়ের সমস্যার কথা বলে আর কে ফোন করবে ডাক্তারের কাছে গিয়ে ওষুধের নাম জেনে আসার জন্য। পারলি ইন্দ্র! কালও যখন পুলক হাসপাতালের ইমারজেন্সির সামনে বলে উঠলো, ‘রূপকদা’ এখন যদি হঠাত ইন্দ্রদা বলে ওঠে কি রে তোদের সবাইকে কেমন চমকে দিয়ে বোকা বানালাম, এবার থেকে সব খবর দিবি তো? ইন্দ্র বিশ্বাস কর বুকটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে । মাত্র এক বছর আগেই বাবাকে হারিয়েছি। গত ২৩ তারিখ সকালে ফোন করে তুই আমায় বলেছিলি ভাই মন খারাপ করিস না, আমরা তো আছি তোর পাশে। এই তোর পাশে থাকা। এভাবে…… এত দূরে থেকে ! পিউর হাতে রান্না খেতে এতো ভালোবাসতিস। আর আসবি না ভাই………… একবার শুধু একবার আয়। আমরা সবাই অপেক্ষায় আছি। তুই কত বড়ো সাংবাদিক ছিলিস, তোর প্রকাশিত বিভিন্ন লেখা নিয়ে অনেক তর্ক বিতর্ক হবে। কিন্তু তুই যে আমাদের খুব কাছের মানুষ ছিলিস , সেটা ২৪ লভেম্বর রাতের হিমেল রাত্রি দশটার কার্জনগেটটাও জেনে গেছে। মন যে কোনো সত্যই মানতে চাইছে না রে ইন্দ্র। সত্যিই তুই ছবি!

Leave a Reply