হারিয়ে গেছে  জমিদারি ঐতিহ্য, প্রাচীন রাস মন্দিরে ফেলা হচ্ছে নোংরা আবর্জনা, উদাসীন প্রশাসন

                                                             ‘আমার বাংলা’ বিশেষ প্রতিবেদন লিখছেন রণদেব মুখোপাধ্যায়

মা ইন্দুরাণী দেবীর ইচ্ছা পূরণে জমিদার গ্রামের কাছাড়ি বাড়ি লাগোয়া রথতলায় ৬ শতক জায়গার উপর তৈরি করলেন সপ্তরত্ন রাস মন্দির। বসতবাড়ির ঠাকুর ঘরে জমিদারের নিজস্ব রাধা বিনোদ জিউর মূর্তি ছিল।রাধা বিনোদ জিউকে ঘিরে গ্রামে জন্মাষ্টমী , অন্নকূট , দোল উৎসব পালন করা হত। গ্রামবাসীরা এই উৎসবকে নিজের মত করে পালন করত। ১৮৭৪ সালে শুরুর দিকে মা ইন্দু রাণী জমিদারপুত্র বনবিহারী দত্ত কে তাঁর মনের ইচ্ছা প্রকাশ করলে গ্রামে রাস উৎসব করার সিদ্ধান্ত হয়। বর্ধমানের জমিদারি নথি থেকে জানা যায় ওই সময় মঙ্গলকোটের লাকুড়িয়া গ্রামের জমিদারের প্রচন্ড অর্থ কষ্ট চলছিল। কিন্তু কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে উত্তরপ্রদেশে থেকে শিল্পী আনিয়ে এই রাস মন্দির তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মাতৃ আদেশ পালন করতে জমিদারি কোষের অভাব থাকা সত্বেও সাড়ে তিন বছর ধরে দফায় দফায় মন্দিরের জন্য প্রায় ৩ লাখ টাকা ব্যয় করেন জমিদার বনবিহারী দত্ত।

15390963_1347460928621694_3574949260526868445_n

 

মন্দিরের গঠনশৈলী নজর কাড়া, চূড়ায় একটি করে বিশেষ ধাতব দন্ড বসানো হয়েছিল।শোনা যায় সাতরত্ন মন্দিরের চূড়া থেকে জমিদারের বিশেষ নিশান উড়তো যা দূর দুরান্ত থেকে দেখা যেত। ১৮৭৭ সালে প্রথম রাস উৎসবের সময় বৃন্দাবন থেকে আচার্যদের আনা হয়। তিন ধরে চলে কৃষ্ণ আরাধনা সঙ্গে চলে নানান আঙ্গিকের কীর্তন, এমনকি বাংলাদেশের যশোর থেকে পালা কীর্তনের দল লাকুড়িয়ার রথতলায় আসে। পরে শেষ দিনে নগর কীর্তন হয় । তারপর থেকে বর্ধমানের লাকুড়িয়ার রাস উৎসবের জাঁকজমকের খ্যাতি আশে পাশের জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি প্রতি বছর কটক থেকে একটি দল কৃষ্ণলীলা পালা গান করতে এই গ্রামে আসত। এই সময় বর্ধমানের রাজা মহতাব বা মহপ্রতাপ চাঁদ লাকুড়িয়ার জমিদার বনবিহারী দত্তকে প্রচুর অর্থ সাহায্য করেছিলেন ধর্মপ্রাণ রাজ পরিবারের উদারমনা ও প্রজানুরাগী স্বভাবের হেতু।
কথাতেই আছে যে নিয়ম চিরাচরিত মেনে আসা হয় তা তো পরম্পরার নামান্তর। যদিও তার শুদ্ধতা বা পবিত্রতা নিয়ে গ্রামের অনেকেরই মনে এখন প্রশ্ন দেখা দেয় । এখনও নিয়ম করে গ্রামের ইষ্টদেবতাদের পুজো হয় , এলাকার প্রবীন মানুষেরা বলে থাকেন এই লাকুড়িয়া গ্রাম হল দ্বিতীয় ‘বৃন্দাবন’। কারণ এখানে পরম বৈষ্ণবদের সব আরাধ্য দেবতারাই ভক্তিমার্গের ধারায় পূজিত হন শুধু ‘রাধা মাধব’ এখানে নেই । এই আক্ষেপ নাকি গ্রামের জমিদারকে এক সময় ভাবিয়ে তুলেছিল। রাধা বিনোদ জিউ,মদন মোহন, শ্যামসুন্দর, জগন্নাথ, মঙ্গলচন্ডী , আর আছে বিরল গৌরাঙ্গ-বিষ্ণুপ্রিয়ার যুগল মূর্তি। এই গৌরাঙ্গ-বিষ্ণুপ্রিয়ার যুগল মূর্তি নবদ্বীপের পর সম্ভবত এই লাকুড়িয়া গ্রামেই আছে বলে ইতিহাসবিদদের মত। এই যুগল মূর্তি কি ভাবে এই গ্রামে এসেছিল সে ব্যাপারে সঠিক কোন তথ্য কেউ দিতে পারেনি। জনশ্রুতি কোগ্রামের পরম বৈষ্ণব লোচন দাসের কোন উত্তরসূরির কাছ থেকে লাকুড়িয়ার বৈষ্ণব প্রাণ মানুষ যদুনাথ রায় গৌড়াঙ্গ-বিষ্ণুপ্রিয়ার যুগল মূর্তি নিজের বাড়ির ঠাকুর ঘরে রেখেছিলেন।

15327494_1347471815287272_7794794417748275468_n
লাকুড়িয়ার প্রভাবশালী কায়স্থ পরিবার ছিল যদুনাথ রায়েদের পরিবার। রায়েদের পরিবারিক দেবতা ছিল এই গৌরাঙ্গ-বিষ্ণুপ্রিয়া যুগল মূর্তি। শোনা যায় সপ্তদশ শতাব্দীর আটের দশকে যদুনাথ রায় কোন পরম বৈষ্ণব গুরুর কাছ থেকে এই বিরল যুগল মূর্তি পান । বিত্তবান যদুনাথ এই গৌরাঙ্গ-বিষ্ণুপ্রিয়ার নিত্যসেবার জন্য আলাদা ঠাকুর বাড়ি, জমি সবই বন্দোবস্ত করেন । গ্রামের জমিদারের গৃহদেবতা রাধা বিনোদ জিউ র আলাদা মন্দির থাকলেও গৌরাঙ্গ-বিষ্ণুপ্রিয়ার আরাধনায় কোন খামতি ছিল না।কিন্তু জনশ্রুতি আছে এত কিছুর পরও যদুনাথের মৃত্যুর প্রায় নব্বই বছর পর পরিবারের সদস্য বিকাশ চন্দ্র রায় একটি ঘটনার জেরে প্রাণভয়ে গৌরাঙ্গ- বিষ্ণুপ্রিয়ার যুগল মূর্তি আর বাড়িতে না রেখে গ্রামেরই গোস্বামীদের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আসেন । শোনা যায় অভয়নাথ রায় প্রচন্ড সাহসী জেদী মানুষ ছিলেন । হিন্দু দেবদেবীর আচার অনুযায়ী ঠাকুর দিনে শয়নে যান এবং সন্ধ্যায় শিতল দিয়ে আবার শয়নের যান । লাকুড়িয়ার গৌরাঙ্গ-বিষ্ণুপ্রিয়ার জন্য রায়েদের ঠাকুরঘরে নির্দিষ্ট খাট বিছানা,বালিশ ,মশারি ছিল। পরম ভক্তিতে সেগুলির যথাযোগ্য ব্যবহারের মাধ্যমে গৌরাঙ্গ-বিষ্ণুপ্রিয়াকে শয়নে রাখা হত। আদৌ ঠাকুর শয়নে যান কি না তার পরীক্ষা করার ইচ্ছা জাগে অভয়নাথ রায়ের ।সাহসী যুবক অভয়নাথ বাড়ির গুরুজনদের নিষেধ সত্বেও মাঝরাতে ঠাকুর ঘরের দরজা খুলে গৌরাঙ্গ-বিষ্ণুপ্রিয়া কি ভাবে ঘুমোয় বা আদৌ ঘুমোয় কি না তা পরীক্ষা করেন।কিন্তু অভয়নাথ কিছুই নাকি দেখতে পাননি এমনকি গৌরাঙ্গ-বিষ্ণুপ্রিয়ার দারুমূর্তিও দেখেন নি বলে জানা যায়। তারপর কিছুদিন পর যুবক অভয়নাথ অজানা রোগের প্রকোপে পড়ে অল্প রোগভোগের পর মারা যান । পরে শোনা যায় অভয়নাথের বংশ লোপ পেয়েছিল। এই ঘটনার কথা গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই রায়েদের ওই ঠাকুর দালানের দিকে ফিরে দেখত না ।ভয়ে আতঙ্কে অভয়নাথের মধ্যম ভ্রাতা বিকাশ চন্দ্র গ্রামেরই গোস্বামীদের বাড়িতে গৌরাঙ্গ-বিষ্ণুপ্রিয়ার মূর্তি নামিয়ে দিয়ে আসেন । সেই থেকে আজ অবধি গৌরাঙ্গ-বিষ্ণুপ্রিয়া দারু মূর্তি লাকুড়িয়ার গোস্বামীদের বাড়িতে নিত্যসেবা পাচ্ছেন। তবে জমিদারের সাধের সপ্তরত্ন রাসমন্দিরে প্রায় পঞ্চাশ বছরের উপর রাস উৎসব পালন করা হয় নি বলেই জানা যায় । বর্তমানে সপ্তরত্ন মন্দিরের গায়ে স্থানীয় বাসিন্দারা ঘুঁটে দেয়, রাজনৈতিক দলের আগ্রাসনের ছাপও স্পষ্ট। মন্দিরের শরীর জুড়ে নানান কাজ সেগুলি কালের কোপে মিশে গেছে। কিছু মানুষ আবার মন্দিরের ভিতরে গোবর সার সহ জঞ্জাল ফেলে । জমিদার বনবিহারী দত্তের আদরের রাধা বিনোদ জিউর উপস্থিতি এক সময় রাস মন্দিরের শোভা বাড়ালেও এখন তার অবস্থা বড়ই সঙিন। তবে এখনও গ্রামে জন্মাষ্টমী, অন্নকূট, রথযাত্রা উৎসব রীতি মেনেই পালন করা হয়, আর জমিদারির ঐতিহ্যের ধারা বজায় রেখে এখনও এক ব্রাহ্মণ কার্ত্তিক মাসের ভোরে ভৈরবী সুরে লাকুড়িয়ার মেঠো পথে গেয়ে যান.. রাই জাগো রাই জাগো শুক সারী বলে, কত নিদ্রা যাও কালো মানিকেরই কোলে…।

Leave a Reply