লাল পাহাড়ির দেশে যা আদিবাসী  গানে মেতে উঠলো বর্ধমান শহর

পুজো শেষ। এবার তাদের  বাড়ি ফিরে যাওয়ার পালা। যাওয়ার আগে বর্ধমানের প্রাণকেন্দ্র কার্জন গেট এলাকায় তাদের ধামসা মাদলের বোলে আর গানের সুরে মেতে উঠলো বিসি রোড। পুজোর ভির ভাট্টা কাটিয়ে একটু হালকা হয়ে ব্যবসাদারেরা শুনলেন সেই আদিবাসী গান , ‘তু লাল পাহাড়ির দেশে যা…’।  বর্ধমান জেলার প্রত্যন্ত জঙ্গলমহলের ঘর-বাড়ি-গ্রাম ছেড়ে পুজোর ক’দিন ওঁরা শহরের পথে পা বাড়ালেন। শহরে থিমের জৌলুসে ভরা ও জাঁকজমকপুর্ণ পুজোর মণ্ডপে মণ্ডপে রাস্তায় রাস্তায় ভেসে বেড়াল আদিবাসী গানের সুর। রঙ-বেরঙের পোষাক পরে নেচে-গেয়ে শহুরে বাবুদের আনন্দ দিয়ে দু-চার পয়সা রোজগারও হয়েছে তাঁদের। রথ দেখা ও কলা বেচা দুয়ে মিলে বাঙালির শ্রেষ্ঠ দুর্গোৎসবের আনন্দে আলাদা মাত্রা যোগ দেয় ওঁদের অংশগ্রহনে। বর্ধমানের জঙ্গলমহল আউশগ্রাম ও কাঁকসার প্রত্যন্ত এলাকার গ্রামগুলি থেকে আদিবাসী সম্প্রদায়ের পুরুষ ও মহিলারা নানা রঙের পোষাক পরে শহরের পুজোর আনন্দে সামিল হতে চলে আসেন।

burdwan-sawtal-nach_photo-2

পুরুষদের পরনে থাকে ‘পাঞ্চি’ এবং মহিলাদের পরনে ‘পিরহেন’। মাথায় রঙিন পাগড়ি। তাতে থাকে পালক। রঙ-বেরঙের নিজস্ব পোষাক পরে পঞ্চমী থেকে দশমী পর্যন্ত বর্ধমান শহরের পুজো মণ্ডপে ও রাস্তায় ঘুরে বেরিয়ে আদিবাসী গান ধরেন। গানের সুরে ধামসা-মাদলের বোলে আদিবাসী নৃত্যের আকর্ষণে পুজোয় আলাদা মাত্রা যোগ হয়েছে। দুর্গোৎসবে সামিল হয়ে সকলকে আনন্দ দিতে পেরে খুশি হয়ে একাদশীতে বাড়ি ফিরে গেলেন মানু হেমব্রম, সামু টুডু, সিধো সোরেন ও লক্ষণ টুডুরা। বাড়ি ফেরার পথে বলে গেলেন, বাপ-ঠাকুরদাদের সঙ্গে ছোট থেকেই এ ভাবে পুজোর সময় এসে আমরা অভ্যস্ত। আমাদের আদিবাসী গ্রামগুলিতে দুর্গাপুজোর কোনো প্রচলন নেই। আর তা ছাড়া পুজোর সময় গ্রামগঞ্জে কোনো কাজও থাকে না। তাই এ নিয়ম যেন যুগ যুগ ধরেই হয়ে আসছে। আমরাও তাই বাঙালির পুজোয় এ ভাবেই নিজেদের যুক্ত করে থাকি। শহরে এসে মণ্ডপে মণ্ডপে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে নাচ ও গান করে বাবুদের আনন্দ দিয়ে আসছি। অনেক সময় আমাদের নাচ-গান দেখে ভাল লেগে রাস্তা থেকে যে সব বাবুদের বাড়িতে পুজো হয় তাঁরা ডেকে নিয়ে যান। বাড়িতে গিয়ে তাঁদের মাতিয়ে রাখার বিনিময়ে খুশি হয়ে আমাদের ভাল ভাল খাবার ব্যবস্থা করেন। রাতে থাকতে দেন। আবার টাকা দিয়ে আমাদের সাহায্যও করেন। আবার পরের বছর আসার জন্যও বলে দেন। এইভাবেই পুজোর ক’টা দিন সকলের সঙ্গে মিলেমিশে কেটে যায়। তাই আমরা চাই, সমাজের সকলকে একত্রিত করে আনন্দ-উৎসবে মাতিয়ে রাখতে বারে বারে পুজো আসুক।

Leave a Reply